১
অথৈ খুব বিরক্ত। ঈদের ছুটিতে বছরে এই একবার বরিশাল যাওয়া হয়। ছোট ভাইয়ের মাধ্যমিক পরীক্ষা কারণে মা ঢাকা ঈদ করবেন। বাবা নির্বাচনের আগে ঈদ না পড়লে ঢাকাতে থাকেন। তাকে একা একা এত দূরে জেতে হবে। দাদু বাড়িতে একা থাকে। কিন্তু পরে দাদু বাড়ি যাবার লোভ সাম্লাতে পারাও কষ্টকর। দাদুর সব সময় একা একা ঈদ করে। খুব মন খারাপ হয়। কোথায় একা যাত্রা করাটা খুব বিরক্তিকর। পাশে কারো সাথে কথা বলার কেউ নেই।
অথৈ ঢাকা ইউনিভার্সিটি ইংরেজিতে থেকে মাত্র অনার্স পাশ করেছ। বাবা একজন উচ্চ পদস্থ ব্যক্তি। বাংলাদেশের ভিআইপিরা ক্ষমতা জোড়ে অনেক অসাধ্য করে ফেলে। গতবার অথৈ যখন বন্ধুদের সাথে ছুটিতে বান্দরবান গেল তাদের প্ল্যান ছিল চিম্বুক পাহাড়ে যাবার। কিন্তু বান্দরবান গিয়ে মনে হল এত কাছে এসে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কেওকারাডং দেখবে না। তাই কি করে হয়? কেওকারাডং নাকি সরাসরি গাড়িতে যাওয়া যায় না। গাড়িতে কাছাকাছি গিয়ে ঘণ্টা দেড়েক ট্রাকিং। ট্রাকিং করে পাহাড় চড়বে। কি মজা হবে। কিন্তু বাবা আগের রাতে মোবাইলে নিষেধ করে দিলেন।
“ট্রাকিং করা এত সোজা নাকি। আমি মনটানাতে একবার ট্রাকিং করেছিলাম। পানি বোতল আর ব্যাগ নিয়ে পাহাড় চড়া কি বাচ্চা খেলা। এত উচুতে উঠতে হয় । অভ্যস্ত হতে হয়। একজন মেয়ে ট্রাকিং করে পাহাড়ে চড়বে পথে কত বিপদ হতে পারে ।” তার হয়ত জীবনেও আর কখনই কেওকারাডং উঠবার সুযোগ হবে না। ইশ ছেলেদের কত মজা। তারা যখন যা চায় তাই করতে পারে। আর মেয়ে হলে পদে পদে ছাড় দিতে হয়। পরের দিন বাবা ফোন ঘুরিয়ে হেলিকাপ্টারের ব্যবস্থা করে দিলেন। ৩ হাজার ফুট উচতে কি সুন্দর লাগল। কি সুন্দর ধোঁয়া ধোঁয়া ধোঁয়াশা চারদিকে। অথৈ ভেবে রেখেছে তার যদি কখনও বিয়ে হয়। সে অবশ্যই স্বামিকে নিয়ে এখানে আবার আসবে। এক হাতে ওর হাত শক্ত করে ধরে অন্য হাত বাড়িয়ে মেঘ ধরবে।
ঢাকা বাস স্ট্যান্ড নামিয়ে দিতে সাদেক আহমেদ এসেছে। সাদেক আহমেদ বাবার ব্যক্তিগত সহকারী। লেখাপড়া এমকম পাস। সব সময় সব কিছুতে সে বাহাদুরি দেখাবে। বাস স্ট্যান্ড এসে সে কিছুক্ষণ যথারীতি হৈচৈ করল। কৃষি প্রতিমন্ত্রী মেয়ে বাসে উঠবে। ফোন করে একদম সামনের জানালা পাশের সিট দিতে বলা হয়েছে। পাশে সিটে মহিলা যাত্রিকেই টিকিট বিক্রি করতে বলা হয়েছে কিংবা মহিলা না থাকলে দরকার হলে সিট খালি যাবে। প্রতিমন্ত্রী মেয়ে বলে কথা। কিন্তু কীভাবে জানি ভুল করে একজন পুরুষকে টিকিট বিক্রি করা হয়েছে। যাকে টিকিট বিক্রি করা হয়েছে সেই পাশে উদাস ভাঙ্গিতে কাউন্টারের সামনেই দাঁড়িয়ে নবাবের মত সিগারেট ফুঁকছে। সাদেক আহমেদের দেখে মনে হল ছেলেটা নিশ্চয়ই পাড়ার গুন্ডা বা মস্তান ।
কাউন্টারের ম্যানেজার অনেকটা বিনয়ের সুরে তার কাছে গিয়ে বললেন “ সরি ব্রাদার, আসলে এই টিকিট আরেক জনের জন্য ছিল আপনি কি একটু দুই সিট পিছনে বসবেন।”
হাতে রাখা পত্রিকা দিকে থেকে কোনক্রমে মাথা তুলে বলল, “ সরি ব্রাদার, আমি টিকিট অনুসারে বসব। আমার দাদী বলেছে নিজের আসন মরতে দাম তাক সম্মুনত রাখিতে ”
অথৈর এই সব বাড়াবাড়ি লাগল। সামান্য একটা ব্যাপার। নিজের কাছেই বিরক্ত লাগছে। সব কিছুতেই তার বাবার পরিচয় চলে আসছে কেন? বাস ছাড়তে এখনো মিনিট দশেক বাকি। আজকের দিন বাজে যাবে। বাসটি নতুন ঝকঝকে কিন্তু তার জানালার উপরে প্ল্যাসে অল্প ক্রাক। নীল রঙের টেপ দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে। সাদেক আহমেদের নজর পড়লে তিনি এটা নিয়েও হৈচৈ করতে পারেন।
বাসটির গায়ে লিখা সুপার ডিলাক্স বাস কিন্তু যে কেউ উঠতে পারে। এমন কেউ একজন তার পাশে বসবে যার গা দিয়ে ভুশ ভুশ করে দুর্গন্ধ বের হবে। পান খাওয়া লাল লাল দাঁত বের করে কুৎসিত ভাঙ্গিতে হাসবে। শার্টের উপরের দুইটা বোতাম খোলা থাকবে। বুকের কাচা পাকা লোম দেখা যাবে। বড় বড় নখ। নখের নিচে ময়লা। কথা বলার সময় মুখ দিয়ে থু থু ছিটবে। দুই পা ফাঁক করে অশ্লীল ভঙ্গিমা বসবে । লোলুপ দৃষ্টি তার বুকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। পৃথীবিতে এর থেকে কুৎসিত দৃশ্য কি কিছু আছে?
২
বাস ছাড়ার সময় হয়ে আসছে। গাড়ির হর্নে আর কন্টাকটরের হাঁকে ছেলেটা প্রায় লাফিয়ে বাসে উঠল। টিকেটে একবার নজর বুলিয়ে ছেলেটা তার পাশে “ ইক্সকিয়স মি ” বলে বসে পড়ল।
অথৈ ধারণা পৃথিবীতে কিছু লোক আল্লাহ পাঠানোর সময় টিউনিং তাদের শরীরের মাদারবোর্ডে লেইট নামের একটা মাইক্রচিপ ঠুকিয়ে দেন । তাদের জন্ম হয় দেরিতে, তাদের বিছানায় ঘুম আসে দেরিতে, অন্যের কথা বুঝে দেরিতে, বাস ট্রেন , এয়ারপোর্টে যায় দেরিতে। ঘাঁটে লঞ্চ দড়ি খুলে হুইসেল বাজিয়ে চলতে সুরু করলেই এরা এক হাতে ব্যাগ আরেক হাতে লুঙ্গি কাছা দিয়ে লাফিয়ে লঞ্চে উঠবে। এই ছেলে নিশ্চয়ই তাদের দলে। বাস ছাড়ার ঠিক আগের মুহূর্ত হয়ত মনে পরছে মোবাইলে টাকা ভারা হয়নি কিংবা মিনারেল ওয়াটার কেনা হয় নি। অথবা দোকানে মিলারেল ওয়াটার এত কম ঠান্ডা কেন এই নিজে ঝগড়া করছে । অথচ বাসের চল্লিশ জন লোকের দেরি হচ্ছে সেই দিকে খেইয়াল নেই। অথৈ এই ররম মানুষদের দেখতে একদম দেখতে পারে না। কেমন জানি গা জ্বলে।
অথৈ খুব কড়া চোখে ছেলেটা দিকে তাকাল। ছেলেটা দেখতে লম্বা, তামাটে, মাথায় কোঁকড়া কোঁকড়া চুল, মুখে দুইদিন সেইভ না করা অম্প খোঁচা খোঁচা দাড়ি, নীল জিন্সের প্যান্ট আর সাদা ফুল শার্ট পরা।
সাদেক সাহেব কন্টাকটরকে ঝাঁকি না হয় সাবধানে গাড়ি চলতে বলেছিল। চালক বুঝছে বলে মাথা নাড়ালেও পিচ ঢালা রাস্তায় তার স্বমহিমায় ফিরে আসল। অথৈর মন হল ড্রাইভার হয়ত ইচ্ছা করেই যেন বেশি দ্রুত চালাচ্ছে।
পাশের ছেলেটা খুবই অদ্ভুত মনে হল। পাশে বসে একবার ঠিক মত অথৈর দিকে তাকাল ওহ না। অথৈ দেখতে হুরপড়ি টাইপের সুন্দরী না হলেও তাকে সবাই সবাই কেন জানি বলে আকর্ষণীয়। তার ভার্সিটির বন্ধুরাও বলে তার সাথে প্রেম করতে নাকি সব ছেলে এক পায়ে খাড়া। পাশে একজন তরুণ বসেছে কিন্তু একবার চোখ তুলে তাকে দেখছে না এটা আসলে একটু অপমান করার মত। ছেলেটা কানে আইপড লাগিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে ঘনাকার যান্ত্রিক ধাঁধা রুবিক্স কিউব মেলাচ্ছে। রুবিক্স কিউব খেলতে খুব ধৈর্যশালী হতে হয়। অথৈ খুবই ছটফটে মেয়ে। একজন বয়স্ক লোক এভাবে মনোযোগ দিয়ে বাচ্চাদের রুবিক্স কিউব মেলাচ্ছে কেন?
একটু পরেই রুবিক্স কিউবটি মিলিয়ে সন্তুষ্টি নিয়ে ছেলেটা চোখ তুলল। নিজের ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে ছোট্ট নোটবুক বের করে কি জানি টুকে রাখল। অথৈ জানে ঠিক না তারপরও কৌতূহলী আড় চোখে তাকাল। নোট বুকের উপর লিখা রুবিক্স কিউব । ছেলেটা কি রুবিক্স কিউব সলভের টামিং নোট করে। একটা খেলাই কি বার বার খেলে। ছেলেটা পাগল নাকি?
৩
ছেলেটা তার দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখে বলল “ তারপর কেমন আছেন ?”
অথৈ চম্কে বলল, “ জি, আমাকে বলছেন?”
“ জি, আপনাকে বলছি ”
“ আমি কি আপনাকে চিনি ?”
“ ওহ আমাদের পরিচয় হল না, আসুন আমরা পরিচিত হই। নাম দিয়ে সুরু করা যাক। ”
“ আমার নাম অথৈ ”
“ আপনার সাথে পরিচিত হয়ে ভালো লাগল ”
অথৈ জবাব না দিয়ে খালি একটু মাথা ঝাঁকাল ।
“ এই দেখুন পত্রিকায় আমার রাশিতে লিখা আছে । নতুন পরিচয় যোগ আছে ”
বিরক্ত গলায় বলল, “ আপনি বাসে একা যাচ্ছেন , আপনার পাশে কেউ না কেউ ত বসত, এটা জানতে রাশিফল দেখতে হয় নাকি ?”
অনেকটা শব্দ করে হেসে বলল, “ বরিশাল ঈদ কাটাতে যাচ্ছেন ?”
“ তাই ত মনে হয় ”
অথৈ অনাগত যাত্রীর যন্ত্রণা বিরক্ত হল। সাথে একটা গল্পের বই আনলে হত। সামনের ট্রাফিক সিগন্যাল বই ম্যাগাজিন কিছু কিনতে হবে। অথৈ ব্যাগ থেকে টাকা বের করে হাতে রাখল। সিটি পার হয়ে গেলে আর হকারও পাওয়া যাবে না।
সিগন্যাল বাস থামতে একজন হকার পেল। অথৈ অনেকটা জোর গলায় হকারকে ডাকল তাকে তাড়াহুড়া করে ৫০ টাকা দিয়ে বলল একটা সাপ্তাহিক ২০০০ আর একটা সানন্দা দাও। তারপরে যা হল তার জন্য অথৈ একদম প্রস্তুত ছিল না। ছেলেটাকে নোটটা দেবার সাথে সাথে সে এক দৌড়ে উঠাও। ড্রাইভার একটা নোংরা কুতশিত গালি দিল। অথৈ নিজের বোকামি কান্না পাচ্ছে। ৫০ টাকা কোন ব্যাপার না কিন্তু এই বাচ্চা বয়সী একটা ছেলে এত অম্প বয়সে প্রতারণা শিখে ফেলছে। দেশের কি হবে?
অথৈ জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছে।
“ আপনার মন খারাপ দেখে খুব খারাপ লাগছে। আপনি যদি চান আমি আমরা মন ভালো করে দিতে পারি।” অথৈ সামান্য হকচকিয়ে গেল। অচেনা পুরুষদের সঙ্গে হড়বড় করে কথা বলার মত মেয়ে সে না।
বিরক্তি নিয়ে বলল, “ জি না ধন্যবাদ , আপনাকে আমার মন ভালো করতে হবে না। ”
“ একটু পড়ে কিন্তু বৃষ্টি নামবে। আপনাকে জ়ানালাটা বন্ধ করে দিতে হবে। ”
অথৈ অনেকটা চোখ পাকিয়ে বলল, “ আপনি কি আবহাওয়া অফিসে চাকরি করেন ?”
“ জি না, আমি পত্রিকায় আবহাওয়া পড়ে জেনেছি ”
“ পত্রিকায় রাশিফল, আবহাওয়া সংবাদ, নামাজের সময় সূচি, সূর্যাস্ত , সূর্যাউদয়ের সময়, আজকের বাণী এই সব কারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে জানেন? যারা বেকার মানুষ , যাদের সময় নষ্ট করার অফুরন্ত সময় আছে।”
বেশ শব্দ করে হেসে বলল, “আপনার ধারণা সঠিক আমি বেকার, আমি আসলে একজন ভ্রাম্যমাণ সাংবাদিক, সদ্য পাশ করেছি। আমি মাঝে মাঝেই লিখা নিউজ পেপারে পাঠাই বেশী ভাগি ছাপায় না। তবে মাঝে মাঝে দুই একটা ছাপায়, লিখা ছাপানো হয়েছে কিনা দেখতে পত্রিকা কিনলাম ”
“ না নিউজ কি ছাপছে ?”
“ জি না, হয় নি ।”
“ আপনার আট টাকা জলে গেল ”
“ যখন কোন কিছু নষ্ট হয় তখন কোন কিছু প্রাপ্তি হয়। আচ্ছা আসুন বাজি ধরি। ফেরি ঘাটে যাবার আগেই বৃষ্টি নামবে যদি নামে আপনি আমাকে চা খাওয়াবেন না নামলে আমি ”
“ আপনি দেখি নাছোড়বান্দা , যদিও আমি ফেরিতে করে বিক্রি চা খাই না তবে রাজি। আহারে আপনার আরো দুই টাকা জলে গেল। ”
“ কেন বাহিরে চা খান না কেন? আপনার বড় ভাই নিষেধ করেছে। ”
“ আমার বড় ভাই আবার কে ? ”
“ ওই যে কাউন্টারের পাজেরো গাড়িতে করে এসেছিল। নেতাগিরি করল ”
এই বার অথৈ আর হাসি আটকাতে পাড়ল না হেসে বলল ” উনি আমার বড় ভাই হতে যাবেন কেন? উনি বাবার পি এস”
“ ওপস, আই বেগ ইউর পারডন ”
৪
ফেরি ঘাটে বাস ফেরিতে উঠবার জন্য অপেক্ষা করছে। কবে যে পদ্মা সেতু হবে? কনট্রাকটর বলল “ আফা বাস, টেরাকের লম্বা লাইন, ফেরিতে যাইতে টাইম লাগব ।”
অথৈ বলল না আমি ঠিক আছি। বলতে বলতেই মা ফোন করেছে। বাস স্ট্যান্ড গাড়ি থাকবে বলে জানাল। এই মোবাইলে এত চার্জ কম থাকে। মোবাইলটি নতুন নিয়েছে তারপরও এত তাড়াতাড়ি চার্চ কমার সঙ্কেত দেখাচ্ছে।
“ ম্যাডাম গাড়িতে বসে থাকবেন, নামবেন না।”
“ না, আমি ঠিক আছি ”
“ আরে নামুন , বাহিরে কি সুন্দর হাওয়া। একটু আধটু হন্টন করুন। শরীরের ব্লাড সারকুলেশন হোক।”
অগত্যা অথৈ নামল। অথৈ নদী খুব ভালো লাগে।
“ ম্যাডাম চা কফি কিছু খাবেন ? ”
“ জি না, আমি বলেছি বাহিরে চা খাই না ।”
“ এরা গরম পানি দিয়ে কাপ ধুয়ে দিবে। আর চা বানাতে টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করে। আমি খোঁজ নিয়েছি । সাংবাদিক মানুষ ত । খুব অনুসন্ধানী মন। ”
“ ওঃ তাই নাকি? কিছু মনে করবেন না। আমি অনেক দিন বিদেশে ছিলাম । আপনার পকেট থেকে আইপডের সাদা হেড ফোন বেরিয়ে এসেছে। পায় নাইকির কেডস, হাতে ওমেগা ব্র্যান্ডের ঘড়ি। আপনাকে দেখে একদম বেকার সাংবাদিক মনে হচ্ছে না। ”
“ আপনি দেখি অনেক কিছু খেয়াল করেন ”
অথৈ তাচ্ছিল্য সুরে বলল, “ আমরা মেয়েরা অনেক কিছু খেয়াল করি । ”
অবশেষে বাস ফেরীতে উঠল । বিকট শব্দে ফেরি চলতে সুরু করল।
টোকাই টাইপের ছেলে ডাব বিক্রি করতে করছে। কাব্য দুটা ডাব কিনে ফেলল। সাত টাকা করে ১৪ টাকা দাম। ২০ টাকা দিল ছেলেটাকে।
ছেলেটা অনেকটা কাকুতি করে বলল “ স্যার ছিগারিট লাগব, আমার লগে ছিগারিট আচে।”
“ না লাগবে না তবে ভাংতি দিতে হবে না পৃথিবীর সর্বাধিক মিষ্টি পানির জন্য তোর ঈদ বকশিশ।”
অথৈ ডাব হাতে নিয়ে বলল, “ আচ্ছা আপনি যে এত বক বক করেন , আপনাকে আগে কেঊ বলছে।”
“ জি না আমি ছোট বেলায় কারো সাথে কোন কথাই বলতাম না সব সময় একা একা থাকতাম । তবে অনেক আগে কে এক জন মেয়ে বলেছিল আমি নাকি খুব চুপচাপ। তাই আল্লাহ আমার পেটে অনেক কথা জমা করেছে। বড় হয়ে সব একসাথে বের হচ্ছে। ”
“ সেই মেয়ের মাথা আপনার মত খারাপ ”
“ কবুল, কবুল কবুল ”
“ কবুল মানে কি ”
“ কবুল মানে হ্যাঁ । মানে ম্যাডাম, আমি আপনার সাথে সহমত ।”
“ আচ্ছা আপনি সেই তখন থেকে ম্যাডাম ম্যাডাম করছেন কেন? আমার নাম অথৈ। ”
“ অথৈ নামটি খুব সুন্দর।”
অথৈ মন এখন কিছুটা ভালো । সেই ছেলেটাকে কিছুক্ষণ আগেও অসহনীয় লাগছিল এখন কেন জানি তাকে এখন খুব একটা খারাপ লাগছে না।
৫
ছেলেটা মাটিতে পড়ে থাকা একটি কাগজ তুলে নিল। বাদামের ঠোঙ্গা মনে হয়। মাধ্যমিক স্কুলের অঙ্কের পরীক্ষা উত্তরপত্র। কোন ছাত্র পাতা জুড়ে বড় বড় যোগ বিয়োগ গুনের অঙ্ক করেছে।
অথৈ অবাক্ হয়ে বলল, “ এটা এত মনোযোগ দিয়ে দেখার কি আছে ?”
“ ১১ দিয়ে ৭৮৫ গুন করাতে ভুল হয়েছে। আমার কাছে থাকলে আমি ওকে দুই মিনিটে এমন একটা কৌশল শিখিয়ে দিতে পারতাম এগার দিয়ে যেকোন সংখ্যাকে মুহূর্তে গুণন করে ফেলত।”
“ ওয়েট আ মিনিট, যে কোন সংখ্যাকে ১১ দিয়ে গুন। আচ্ছা বলুন ৫৪৭৮৮ গুন ১১ কত হবে ?”
“ ৬০২৬৬৮ ”
“ হ্যাঁ, দাঁড়ান আরেকটু ধরি ৪৫৭৬০৯৭৯০৮০২৭ গুন ১১ কত হবে ?”
“ এভাবে বলতে সংখ্যা মনে রাখতে পাড়ব না। সংখ্যা কাগজে লিখে দিন। ”
অথৈ কাগজে লিখে কাব্যর দিকে বাড়াল কাব্য সাথে সাথে নিচে লিখে ফেলল ৫০৩৩৭০৭৬৯৮৮২৯৭।
হতভম্ব হয়ে অথৈ জানতে চাইল, “ কীভাবে করলেন ?”
“ ধরুন ৫১২৩৬X১১ বের করবেন।প্রথমে সংখ্যাটির আগে একটা ০ বসান এবং সংখ্যাটির নিচে একটা লাইন টানুন। তাহলে সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ০৫১২৩৬, এককে অংকটা (৬) সরাসরি লাইনের নিচে (৬ এর নিচে) বসান, এবার দশকের অংকটা (৩) ডানের অংকের (৬) সাথে যোগ করে (৩+৬=৯) দশকের অংকের ঠিক নিচে (৩ এর নিচে) বসান, একই ভাবে শতকের অঙ্ক (২) তার ডানের অঙ্ক (৩) এর সাথে যোগ করে (২+৩=৫) শতকের অংকের ঠিক নিচে বসান, এভাবে ১+২=৩ বসবে ১ এর নিচে, ৫+১=৬ বসবে ৫ এর নিচে, ০+৫=৫ বসবে ০ এর নিচে, তাহলে ফলাফল দাঁড়াচ্ছে ৫১২৩৬X১১=৫৬৩৫৯৬। ”
একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল, “ আমরা ছাত্রদের তোতা পাখি মত নামতা শিখাই। ১ থেকে ১০ ঘরের। আপনি নিজেও জানেন কিন্তু মনে মনে গুন করুন ২০X২০ পর্যন্ত:মাত্র ৫ মিনিটে আপনি শিখে যাবেন ২০X২০ এর মধ্যে যেকোন সংখ্যার গুন কীভাবে করা যায়। তাহলে আপনি প্রস্তুত? মনে করুন আপনি গুন করছেন ১৫X১৩=? মনে মনে বড় সংখ্যাকে উপরে ও ছোট সংখ্যাকে নিচে সাজান, প্রথমে উপরের ১৫ এর সাথে নিচের ৩ যোগ করুন, অর্থাৎ ১৫+৩=১৮, এর সাথে ০ যোগ করুন, অর্থাৎ ১৮০, উপরের ৫ এর সাথে নিচের ৩ গুন করুন, অর্থাৎ ৫X৩=১৫, আগের ফলাফলের সাথে এই ১৫ যোগ করুন, অর্থাৎ ১৮০+১৫=১৯৫। কি মজা না? ”
অথৈ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “ কাব্য তোমাকে চিনতে এত সময় লাগল। তুমি অনেক শুকিয়ে গেছ। আর অনেক লম্বা হয়ে গেছ। ”
“ হে হে এতক্ষন পড়ে বুঝলে ”
“ হুঁ, আমি বোকা মেয়ে তোমার মত এত প্রতিভাবান না, তুমি বললে না কেন? ”
“ দেখলাম তুমি চিনতে কর সময় নাও। ”
“ আমি তোমাকে দেখা মাত্রই মনে হয়েছে তোমায় কোথায় যেন দেখেছি। আচ্ছা তোমার মোটা ফ্রেমের চশমাটা কোথায় ?”
“ চোখের অপারেশন করা হয়েছে তাই এখন আর চশমার দরকার পড়ে না। অথৈ তুমি দেখতে খুব মায়াবতী হয়েছ।”
পদ্মায় গোধূলি সূর্য আলো চিক্চিক্ করছে। বাতাস অথৈর চুল উড়ে বার বার মুখের সামনে চলে আসছে।
চলবে...
4 টি মন্তব্য
বৃষ্টির জলে হাত ভিজাই ( তৃতীয় পর্ব )
তারিখ:
10/24/2007
অনুসন্ধান
বিভাগ
- একুশে ফেব্রুয়ারী (2)
- কবিতা (5)
- ক্রিকেট (6)
- গান (2)
- চলচ্চিত্র (2)
- ছেলেবেলা (5)
- ছোট গল্প (5)
- প্রবাস জীবন (12)
- প্রযুক্তি (5)
- বাংলাদেশ (8)
- ভ্রমন কাহিনী (3)
- মুক্তিযুদ্ধ (7)
সাম্প্রতিক পোষ্ট
সাম্প্রতিক মন্তব্য
- ইরতেজা ভাই, আপনার সাইটটি দারুণ লাগলো! চমৎকার সাজিয়... - মুকুল
- hello. - Nuzrah Jamal
- ইরতেজা ভাই, নতুন লেখা কই ? - toxoid_toxaemia
- ওহে বালক! আমার url তো দেয়া আছে! :P: P - রাশেদ
- আর পরের পর্ব! :( - রাশেদ
পূর্ববর্তী লেখা






4 টি মন্তব্য:
চমৎকার....! পরের পর্বগুলোর জন্য অপেক্ষায় আছি।
আমিও পরের পর্বগুলোর অপেক্ষায় গোঁফ দাড়ি পাকিয়ে ফেলছি। এটা প্রায় ৩ মাস আগে(বা তারও বেশি পড়েছিলাম!)
আর পরের পর্ব! :(
ওহে বালক! আমার url তো দেয়া আছে! :P: P
আপনার মন্তব্য লিখুন
কিছু এইচটিএমএল কোড ব্যবহার করতে পারেন।