| 5 টি মন্তব্য ]


ছুটির দিন, অলস দুপুর। বৃষ্টি দেখতে দেখতে গরম চা খাচ্ছি। খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির পানি ছিটা এসে লাগে। ছিটাছিটি ফোঁটাগুলো আমার টেবিল, ল্যাপটপ, এলোমেলো বইপত্র ভিজিয়ে দিচ্ছে। মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দেখলেই কেমন জানি আনমনা হয়ে যাই।

বৃষ্টি-বাদল দিনে আমাদের বাসা থেকে থেকে ইয়ারা নদী দেখতে খুব সুন্দর লাগে। ইয়ারা নদী সর্পিল ভাবে মেলবোর্ন শহরের উপর দিয়ে পশ্চিম থেকে পূর্বে বয়ে গিয়ে পোর্ট ফিলিপ সাগরে পরেছে।

এখন আইপডে একটা হালের হিন্দি গান শুনছি। “ রাব নে বানা দি জরি ” ছবির এই গানটা বেশ পছন্দ হয়েছে।

পেয়ার হুয়া
ইকরার হুয়া
জিনা ইয়া হা
মারনা ইয়া হা
ইন বাহো কো
ইন রাহো কো
ছোর এ ছালিয়া
যায়ে কাহা...
মানা দিল তো হ্যায় আনারি
এ আওয়ারা হি সাহি
আরে বোল রাধা বোল
সংগম হোগা কে নেহি

হার জানাম মে রাং বাদালকে
খাবকে পারদপে হাম খিলতে

হাম হে রাহি পেয়ার কে
ফির মিলেঙ্গে চালতে চালতে

গত কয়েক দিন ধরে ভিক্টোরিয়া স্টেটে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। এখানে হঠাৎ ব্যাপক বৃষ্টি শুরু হয় কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আবার থেমে যায়। কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবার নামে। দূর! বৃষ্টি-বাদলেও আজকাল কেমন যেন ভেজাল, দুই নম্বরী। পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর বৃষ্টি হয় বাংলাদেশে। আহা! কি সুন্দর ঝুমঝুম বৃষ্টি।

এখানে লোকজন বৃষ্টি একদম পছন্দ করে না। লন্ড্রী রুমে আমাকে দেখে পাশের বাসার বুড়ি নাক সিট্‌কে বলল, “দেখছ? কি বাজে আবহাওয়া।” আমিও তার সাথে গলা মেলালাম। আহত গলায় বলি, “আসলেই খুব জঘন্য আবহাওয়া।” সীড়িতে স্বর্ণাকেশী স্টেসি বলল, “ উফ! বাহিরে কি বৃষ্টি, আজ ভেবেছিলাম ওকে নিয়ে একটু বাহিরে হাঁটব, তুমি কি দেখেছ বাড়িতে থাকতে থাকতে থাকতে বেচারী্র চর্বি জমে গেছে।” আমিও ওর পিচ্চি তুলতুলে সাদা কুকুরের দিকে তাকিয়ে বলি, “আহারে! আসলেই ত।”

কিন্তু আমার মনে আজ অনেক ফুর্তি। আহারে কি আনন্দ! কি সৌন্দর্য, বৃষ্টি হচ্ছে। আজ সব কিছু ভেসে যাক। বান ডাকুক ইয়ারা নদীতে...

দিল কা ভাওয়ার কারে
কারে পুকার যাব
পেয়ার কিসি সে হোতা হ্যায়
জিয়্যা ওহ জিয়্যা কুছ বোল দো
আব দারদ সা দিল মে হোতা হ্যায়
ও তেরে ঘরকে সামনে
এক ঘর বানাউনগা টুটা হি স্যাহি
পাল ভার কে লিয়ে কোই হামে পেয়ার কারলে
ঝুটা হি সাহি
ঝুটা হি সাহি

হার জানাম মে রাং বাদালকে
খ্যাবকে পারদপে হাম খিলতে

হাম হে রাহি পেয়ার কে
ফির মিলেঙ্গে চালতে চালতে
হাম হে রাহি পেয়ার কে
ফির মিলেঙ্গে চালতে চালতে

গত রাতে মেলবোর্ণ সেন্ট্রালে প্রিয় অভিনেতা শাহরুখ খানের নতুন ছবি এর প্রিমিয়ার শো দেখে বাসায় ফির ছিলাম। মাল্টিপ্লেক্স থেকে বের হয়েই দেখি প্রচণ্ড বৃষ্টি। স্টেট লাইব্রেরীর সামনে ট্রামে উঠবার পর মনে হল বৃষ্টি বোধ হয় একটু কমতি দিকে । বোটানিকাল গার্ডেন আসতে আসতেই দেখি আবার আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি পড়ছে। রাত দেড়টা বাজে। আসে পাশে কোন কফি শপও খোলা নেই যে বসে বসে গরম গরম সয় মিল্ক ক্যাপাচিনো বা কফি ল্যাটে পান করতে করতে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করব। আশে পাশে কোন ছাঊনিও খুঁজে পেলাম না। কি আর করা । জিন্স হাঁটু অবধি গুটিয়ে নিলাম। শার্ট খুলে কোমরে শক্ত করে বাধলাম। ধুমিয়ে একটা দৌড় দিলাম ।

ওহ হাসিনা
জুলফ ওয়ালি
জানে জাহা
চাহে মুজক
জাংলি কেহ দে
সারা জাহা
ওহ মেহফিল মেহফিল তু খিলে

ইয়াহু ইয়াহু দিল কারে
বদনপে সিতারে লেপ্তে হুয়ে
হার জানাম মে রাং বাদালকে
খাবকে পারদপে হাম খিলতে

হাম হে রাহি পেয়ার কে
ফির মিলেঙ্গে চালতে চালতে
হাম হে রাহি পেয়ার কে
ফির মিলেঙ্গে চালতে চালতে



ঝড়-বৃষ্টির রাতে রাস্তার মাঝখানে একজন জগিং করতে করতে যাচ্ছে এই ফাজলামী অনেক বেরসিক গাড়ি চালকের পছন্দ হল না। আবাসিক এলাকা তারপরও কয়েক জন হালকার উপর পাতলা হর্ন দিয়ে আমার পাগলামীর তীব্র প্রতিবাদ জানাল। একজন ট্যাক্সি চালক গতি কমিয়ে গ্লাস নামিয়ে বলল “ ইউ অলরাইট মাইট”। আমি বললাম, “ আই এম ওকে মাইট, তুই তোর রাস্তা মাপ”। ভাড়া পাবার আশা নেই দেখে সেও একটু হতাশ হয়ে তুরাগ রোডের দিকে টার্ন নিয়ে চলে গেল। ভিজে ভিজে জবজব হয়ে বাসায় আসলাম।

দারদ দে দিল
কার দে জিগার
জামানা কো দিখানা হ্যায়
হ্যাম কিসি সে কাম ন্যাহি
তুজক ইয় বাতানা হ্যায়
ইয়েজ ওয়াদা রাহা ওহ মেরি ছাঁদনি
হার জানাম মে রাং বাদালকে
খাবকে পারদপে হাম খিলতে

হাম হে রাহি পেয়ার কে
ফির মিলেঙ্গে চালতে চালতে
হাম হে রাহি পেয়ার কে
ফির মিলেঙ্গে চালতে চালতে

বৃষ্টিতে ভিজলে এখন আমার ঠাণ্ডা লাগে না। সর্দি কাশিও হয় না। শৈশবের একটা কথা বলি। আমি আর আমার দিদি তখন নন্দন কানন ফুলকি স্কুলে পড়তাম। হয়ত চতুর্থ শ্রেণি পড়ি। দুপুরে মায়ের ক্লাস থাকলে বাসায় নেবার জন্য বাবা স্কুলে আসত। কিন্তু প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণেই হোক বা অন্য কারণেই হোক সেই দিন কোন রিকশা পাওয়া যাচ্ছিল না। আমরা আবদার করলাম আজ বৃষ্টিতে ভিজব। বাবা প্রথমে রাজি না হলেও পারে আমার বোনের কান্না থামাতে রাজি হয়ে গেল। আনন্দের লাফাতে লাফাতে ছোট বোন বলল, “কি মজা, কি মজা, আজ বিষতিতে দোছল কলবো।”

ফুলকি স্কুল থেকে লাভ লেইন বেশি দূরে না। কাকভেজা হয়ে বাসায় এসেই আমি আর আমার বোন ঠান্ডায় কাঁপুনি দিচ্ছি। ঘন ঘন হাঁচি দিতে লাগলাম। বাবা বুঝল সে একটা ভালো রকম ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেছে।

টাওয়েল দিয়ে আমাদের মাথা মুছতে মুছতে বাবা বলল, “ মা, বেশি শীত করতাছে?”
ছোট বোন আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বলল, “ না”
“মা, বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে ভিজতে ঠাণ্ডা লাগে না। বরং বৃষ্টিতে ভিজলে আল্লার কাছে কিছু চাইলে সেটা পাওয়া যায়।”
বোকা বোন প্রশ্ন করে,“কবে পাওয়া যায়?’
বাবা একটু চিন্তা করে বললেন, “ ঈদের আগের রাতে পাওয়া যায়।”
“ যা চাব তাই পাব।“
“ অবশ্যই”
ছোট বোন হাত তালি দিয়ে বলল, “পেঙ্গুইন খেলনা চাইলে সেটা পাব।”
বাবা বলল, “ অবশ্যই, পেঙ্গুইন খেলনাও পাওয়া যাবে।”


আমি আর আমার বোন কিছু দিন আগে বাবা মার সাথে একজন কাস্টম অফিসারের বাসায় গিয়ে ছিলাম। সেখানে আমাদের সম বয়সী তার মেয়ের একটা খেলনা আমার বোনের খুব পছন্দ হয়েছিল। আমার যতদূর মনে পড়ে খেলনাটি ছিল কিছু ছোট ছোট পেঙ্গুইন। ব্যাটারি চালিত সিঁড়ী দিয়ে একবার পেঙ্গুইন উপরে উঠত আবার নিচে নামত। সাথে এক ধরনের মিউজিক বাজত। নিউ মার্কেটে পরে খেলনাটা খুঁজে পাওয়া গিয়ে ছিল। সেই আমলে ৩০০ টাকা অনেক টাকা। একজন মধ্যবিত্ত সাংবাদিক পরিবারের এত দামী খেলনা কেনার সামর্থ্য ছিল না।

বৃষ্টি স্নান আমরা মায়ের কাছ থেকে সিক্রেট রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু শত চেষ্টার পরো কীভাবে মা সিটি কলেজ থেকে আসতেই পাঁচ মিনিটে আমাদের সিক্রেট জেনে গেল। আসলে ভাগ্য আমাদের সাথে ছিল না। বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে ভিজতে ঠাণ্ডা লাগে না বাবার সেই থিসিস ভুল প্রমাণ করেই আমার বোনের জ্বর এল। । মা বাবাকে আচ্ছা মত বকা দিল। পরের কয়েক দিন বাবা বসার ঘরের সোফায় ঘুমিয়েছিল। ইস্‌! মা খালি বাবাকে বকত।

হাম হে রাহি পেয়ার কে
ফির মিলেঙ্গে চালতে চালতে

5 টি মন্তব্য

toxoid_toxaemia বলেছেন... @ 16/12/08

আহারে ভাই খালি মেলবোর্নের বৃষ্টিকে দুষে লাভ নেই। সিডনীতেও একই অবস্থা, বৃষ্টি বাবাজি মহা ফাজিল এবং বিরক্তিকর তো বটেই। এখানের বৃষ্টি আমার আরেকটা কারণে বিরক্ত লাগে তা হল- বৃষ্টি পড়লেই ঠান্ডা লাগে। আমার আবার ঠান্ডা বিশেষ পছন্দ নয়। বাংলাদেশে বৃষ্টি হলে রাস্তা-ঘাট ডুবে যায় ঠিকই কিন্তু তাও সে বৃষ্টির অন্য কিছুর সাথে তুলনাই হয়না।

~ মেঘের অনেক রং ~ বলেছেন... @ 22/12/08

Chomotkar lekha.....
Ek nishashe pore shes kore fellam...
Bishes kore Bon are Baba'r kothopokothon gulo beshi vhalo legeche. :)

BrishtiBilashini বলেছেন... @ 21/1/09

khub bhalo laglo...kichukhon chondher sathe othoba shobder sathe mishe chilam...besh likhen apni.

kallol lahiri বলেছেন... @ 19/2/09

আপনার লেখা খুব সুন্দর... ঝরঝরে... ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের মতো। বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে জ্যোতস্নার যে ফুল ফোটে...বিষাদ সিন্ধুর সুরে দুলতে দুলতে নানী গেরস্থালীর কাজ গুছিয়ে রাখেন...আর কোনো এক সময়ে এক অমর কবিতা শেষ হয় একুশে ফেব্রুয়ারীর অলৌকিক ভোরে...এত কথা এইভাবে এত ছড়িয়ে লিখলাম কেন জানেন? আপনার লেখার মাঝে ওই হিন্দি গানের জায়গাটুকু বাদ দিলে, আপনার লেখাকে আমার এক টুকরো ছবি...এক টুকরো কবিতা কথা মনে হলো তাই। এই ভারচুয়াল জগতে ঘুরতে ঘুরতে এমন একটা লেখা পাওয়াও অনেক প্রাপ্তির মধ্যেই পরে। আপনার স্কুলের নামটা ভারী সুন্দর। আর আপনার অতীতচারীতাও...। ভালো থাকবেন।

sakil_imran বলেছেন... @ 22/6/09

Brishti amar o khub valo lage. Kintu apnar lekha ta pore brishti k aro beshi onuvob korsi. Apnar otit jiboner sriticharon khub upovog korlam. Onek valo laglo lekhata.

Ami aj aro dui jon probashi Bangladeshi er blog porlam. Ami ashole apnader deshprem dekhe onek gorbo bodh korsi. Amra jara desh e thaki tara mone hoy etota onuvob kori na, ja apnara koren. Ami ashole desh k niye onek shopno dekhi, jani na shopno gulo bastob e rup nebe ki na.

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন